
বাংলাদেশের জন্মকথা ছোটদের জন্য: পর্ব – ১
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, ও বীরত্বগাথায় পরিপূর্ণ। এই ইতিহাস শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মকথা নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, অধিকার এবং মর্যাদার জন্য লড়াইয়ের দলিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ও ভাষা আন্দোলন
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আবাস হলেও, শাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। এ বৈষম্য শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শুধু উর্দুকে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বাংলার জনগণ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ নেয় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, যেদিন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার শহীদ হন। এই দিনটি আজ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
ছয় দফা আন্দোলন ও বাঙালির জাগরণ
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এটি ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির ইশতেহার। শাসকগোষ্ঠী এই আন্দোলন দমন করতে চায় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। এর বিরুদ্ধে শুরু হয় গণআন্দোলন, শহীদ হন আসাদসহ অনেকেই।এই আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ রোপণ করে এবং দেশের আনাচে-কানাচে স্বাধীনতার দাবি পৌঁছে দেয়।
এই ছয়টি দফার মূল দাবি ছিল:
১. প্রতিটি প্রদেশের জন্য আলাদা মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থা।
২. পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ছাড়া সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে।
৩. পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা অর্থনীতি ও বাণিজ্যনীতি।
৪. রাজস্ব ও শুল্ক আদায়ে প্রাদেশিক সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
৫. পূর্ব পাকিস্তানে পৃথক মুদ্রানীতি ও ব্যাংক ব্যবস্থা।
৬. মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠনের অধিকার।
১৯৭০ সালের নির্বাচন ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়লাভ করে। এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রকাশ, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টি করে।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও গণহত্যা
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে গণহত্যা চালায়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। পরদিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়।
নয় মাস ধরে চলে মুক্তিযুদ্ধ, যেখানে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে লড়াই করে। ভারতও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
বিজয়ের মুহূর্ত ও স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত নেতৃত্বে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল একটি দেশের জন্মের কাহিনী নয়—এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীন অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার অনন্য দলিল। এই ইতিহাস প্রতিটি নাগরিকের গর্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস।
Tag:history