
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে মোট কত রাকাত পড়তে হয়?
নামায একজন মুসলমানের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধুই একটি ফরজ দায়িত্ব নয়, বরং আত্মিক প্রশান্তির একমাত্র উপায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করেছেন। প্রতিটি ওয়াক্তের নামাযের নির্দিষ্ট কিছু রাকাত রয়েছে—কিছু ফরজ, কিছু সুন্নত, কিছু ওয়াজিব (যেমন বিতর) কিছু নফল। কিন্তু অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত হন—প্রতিদিন আসলে মোট কত রাকাত নামায পড়া উচিত?
ফজর নামায (ভোরবেলা)
ফজরের নামাযে মোট ৪ রাকাত নামায পড়া হয়। এর মধ্যে:
- ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (যে সুন্নত রাসূল (সা.) কখনোই ছাড়েননি)
- ২ রাকাত ফরজ
ফজরের সুন্নতের ফজিলত:
রাসূল (সা.) বলেছেন—“ফজরের দুই রাকাত সুন্নত, পৃথিবী ও তাতে যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।”
— সহীহ মুসলিম
জোহর নামায (দুপুর)
জোহরের নামাযে মোট ১০ রাকাত নামায আদায় করা হয়:
- ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের আগে)
- ৪ রাকাত ফরজ
- ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের পরে)
জোহরের আগে-পরে সুন্নত আদায়ের ব্যাপারে নবী করিম (সা.) খুব যত্নবান ছিলেন।
আসর নামায (বিকাল)
আসরের নামাযে মোট ৮ রাকাত নামায আদায় করা হয়:
- ৪ রাকাত সুন্নতে গাইরে মুয়াক্কাদা (অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, তবে বাধ্যতামূলক নয়)
- ৪ রাকাত ফরজ
অনেক সাহাবী নিয়মিত আসরের আগেও সুন্নত পড়তেন।
মাগরিব নামায (সূর্যাস্তের পর)
মাগরিবের নামাযে মোট ৫ রাকাত পড়া হয়:
- ৩ রাকাত ফরজ
- ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা
ফরজের পর এই দুই রাকাত সুন্নত নবীজি নিয়মিত আদায় করতেন এবং ছাড়তেন না।
এশা নামায (রাত)
এশার নামাযে সর্বমোট ১৩ রাকাত নামায আদায় করা হয়:
- ৪ রাকাত সুন্নতে গাইরে মুয়াক্কাদা (ফরজের আগে)
- ৪ রাকাত ফরজ
- ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের পরে)
- ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব (সর্বশেষ রাতে পড়া হয়)
বিতর নামায এশার পরে পড়া ওয়াজিব। রাসূল (সা.) কখনোই বিতর নামায ছেড়ে দেননি।
৫ ওয়াক্ত ফরজ সুন্নত, বিতর নামায ছাড়াও কিছু নফল নামায রয়েছে, যেগুলো রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো আদায় করতেন এবং তাতে অনেক ফজিলত রয়েছে।
নফল নামায কী?
নফল নামায হলো ঐচ্ছিক নামায, যা ফরজ বা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো পড়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে আদায় করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নফল নামায এক অনন্য উপায়। রাসূল (সা.) নিজেও নিয়মিত বিভিন্ন সময় নফল নামায আদায় করেছেন।
৫ ওয়াক্ত নামাযের সাথে আদায়যোগ্য নফল নামায
তাহিয়্যাতুল মসজিদ (মসজিদে প্রবেশের নফল নামায):
- মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে ২ রাকাত নফল নামায।
- হাদীসে এসেছে, “তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে বসার পূর্বে যেন ২ রাকাত নামায আদায় করে।” — সহীহ বুখারী
সালাতুল আওয়াবীন (মাগরিবের পর):
- মাগরিব নামাযের পর ৬ রাকাত নফল নামায।
- এটি ‘তওবাকারীর নামায’ নামে পরিচিত এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
- হাদীসে আছে: “যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ৬ রাকাত নামায পড়ে, তার ৭০ বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” — তিরমিযি
তাহাজ্জুদ নামায (রাতে):
- ফরজ এশা ও বিতরের পর রাতে ঘুম থেকে উঠে পড়া হয়।
- সর্বোচ্চ ৮–১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়।
- এটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নফল নামায। কুরআনে এটি প্রশংসিত হয়েছে।
ইশরাক নামায (সূর্য ওঠার পর):
- ফজরের ফরজ পড়ে সূর্য উদয়ের ১২–১৫ মিনিট পর ২ বা ৪ রাকাত নফল নামায।
- রাসূল (সা.) নিয়মিত এই নামায আদায় করতেন।
দুহা নামায (চাশতের নামায):
- সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে আদায়যোগ্য।
- ২ থেকে ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়।
- হাদীস: “প্রতিদিন মানুষের দেহের প্রতিটি অঙ্গের জন্য সদকা দেওয়া ফরজ। দুহা নামায এই সদকার কাজ পূরণ করে।” — সহীহ মুসলিম
যেসব সময় নফল নামায পড়া নিষেধ
হাদীস অনুযায়ী কয়েকটি সময় নফল নামায আদায় করা নিষেধ, যেমন:
- সূর্য উদয়ের সময়
- সূর্য ঠিক মাথার ওপরে থাকা সময় (যোহরের কিছু আগে)
- সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়
নামায কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং একটি জীবনের পথনির্দেশ। আমরা যদি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করি, তাহলে আমাদের জীবন হয়ে উঠবে আলোকিত, সুশৃঙ্খল ও কল্যাণময়।আসুন, আজ থেকেই নামাযে যত্নবান হই। সময়মতো নামায পড়ি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তৌফিক দান করুন।